আবরার হত্যা মামলা নিয়ে বিতর্কে শিশির মনির: যা বললেন ফাইয়াজ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যায় জড়িতদের পক্ষে আইনজীবী হিসাবে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শিশির মনিরের নাম আসার পর সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সমালোচনার।
বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এই নিয়ে কথা বলেছেন আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ। বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) নিজের ফেসবুক আইডিতে এনিয়ে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি।
নিচে আবরার ফাইয়াজের পোস্টটি তুলে ধরা হলো-
আসামীপক্ষের আইনজীবী সংক্রান্ত বিষয়টি আব্বুর থেকে জানতে পারি গত ২৪ তারিখে। তবে আদালতের শুনানি শেষ হয়ে যাওয়ায় এ বিষয়ে কথা বলে কোনো লাভ ছিলো না। আবার যে দুই দল আবরার ফাহাদের বিষয়ে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ছিলো, তারাই এই ঘটনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করুক এমনটাও চাইনা বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে দেখলাম, এই সুযোগে যেই সাত আসামীর পক্ষে উক্ত আইনজীবী লড়ছেন, তাদেরকেই রীতিমতো নির্দোষ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাকেই দেখলাম বেশ কয়েকজন মেসেজ দিয়ে বুঝাচ্ছেন যে, সেই সাতজনকে অতিরিক্ত শাস্তি দেওয়া হয়েছে! তো এখানে কয়েকটা পয়েন্ট নিয়ে কথা বলা উচিত:
১. প্রথমেই যে কথাটা আসে যে, আওয়ামী লীগ সরকার নাকি জনতুষ্টির জন্য রায় দিয়েছে। অথচ ঘটনা পুরোই উলটো। শেষ মুহুর্তে গিয়ে বেশ কয়েকজনের সাজা কমানোর জন্য স্বয়ং তৎকালীন আইনমন্ত্রী চেষ্টা করেছেন। আসামীর পরিবার ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রীকে ম্যানেজ করা গেলেও, বিচারকের দৃঢ়তার কারণে সুবিধা করতে পারেননি।
২. যেই সাতজনের পক্ষে উনি: (যাদের কথা টেনে ডিফেন্ড করা হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে কিছু অভিযোগ যুক্ত)
(i) মেহেদী হাসান রাসেল: তৎকালীন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। যে সরাসরি লাশগুম আর ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
(ii) মেহেদী হাসান রবিন: আবরার ফাহাদকে টার্গেটের মূল হোতা। যে ৩রা অক্টোবরের মিটিংয়ে নির্দেশ দেয় আবরার ফাহাদকে গেস্টরুমে আনতে। ভাইয়ার রুমমেট মিজান, এই রবিনকেই জানায় যে ভাইয়াকে শিবির মনে হয় তার।
(iii) অমিত সাহা: যে সেদিন রাতে উপস্থিত ছিলো না। কিন্তু ৫ ঘণ্টার মারার পরে ২০১১ থেকে ২০০৫ এ নিয়ে যাওয়ার পরে অবস্থা দেখে মেসেঞ্জারে নির্দেশ দিয়েছিলো যে, ওরে আরো দুই ঘণ্টা মারা যাবে। (উনার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আছে)
(iv) মাহমুদ সেতু: খুব সম্ভবত এর কথা দিয়েই বলা হচ্ছে যে, জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়ায় ফাসির রায় হয়েছে। কথা ভুল না, তবে অসম্পূর্ণ। উঁকি দেওয়ার পরে যারা মারতেছিলো, তারা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো যে, ভাই কিছু তো স্বীকার করেনা। তখন সে বলেছিলো, তাইলে আরো মারতে থাকো।
(v) শামীম বিল্লাহ
(vi) নাজমুস সাদাত
(vii) হোসেন মোহাম্মদ ত্বোহা
৩. দেখেন, আমরা কোনোভাবেই চাই না যে কোনো নির্দোষ শাস্তি পাক। আমরা চাই ন্যায়বিচার। তবে একটা বিষয় কী, এই হত্যাকাণ্ডের দায় কী শুধুই ২৫জনের উপরে ছিলো? অবশ্যই না। যেই মাত্রার অপরাধে এদের শাস্তি হয়েছেন বলে আপনারা মনে করছেন, তা সত্যি হলে শতাধিক আসামী হতো।
৪. কিন্তু এই যে, একজন আইনজীবী ও তার রাজনৈতিক সমর্থকদের ব্যবহার করে যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া নিয়েই জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করা হলো, এর দায় কারা নেবে?
একজন আইনজীবী তার পছন্দ মতো যেকোনো মামলা নিতেই পারে। এখানে আমার কোনোই আপত্তি নেই। কিন্তু সে যাদের মামলা নিয়েছে তারা নির্দোষ এটা কীসের আলাপ ভাই! উনি আদালতে অনেক চেষ্টা করেও যে ক্ষতিটা করতে পারেননি, সেটা আপনাদের ‘উনি যাদের মামলা নিয়েছেন তারা অতটাও দোষী না’ প্রমাণের চেষ্টার মাধ্যমে হচ্ছে।
পরে অপর এক পোস্টে আররার ফাইয়াজ লিখেছেন, আইনজীবী শিশির মনির ভাই আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং উনার পোস্টের বিষয়েও অবগত করেছেন।
খুব বেশী হলে ১০-১২ দিনের মধ্যেই হয়তো উচ্চ আদালতের রায় আসবে। এখন আর কে দোষী আর কে নির্দোষ, সেই বিতর্ক করে দয়া করে আসামীদের বিচার প্রভাবিত করার সুযোগ করে দিয়েন না।
এরআগে বিষয়টি নিয়ে নিয়ে মুখ খুলেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির। বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফাইড পেজে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান জানানোর পাশাপাশি মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।
ওই পোস্টে তিনি লিখেন, হাইকোর্টে শহীদ আবরার ফাহাদের মামলার শুনানি শেষ। রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ। বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া সমীচীন হবে না। আমি আপনাদের আবেগ-অনুভূতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, হাইকোর্টের রায় যাই হোক- আপিল বিভাগে কারও পক্ষে আমি এই মামলা পরিচালনা করব না ইনশাল্লাহ।
তিনি আরও লিখেন, বিষয়টি নিয়ে শহিদ আবরারের পরিবারের সঙ্গেও আমি কথা বলব। আশা করি, সকলেই বিষয়টি সৌহার্দপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখবে।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরারকে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে পরদিন চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। ৩৭ দিনে তদন্ত শেষ করে ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। পরে ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়। বিচার শেষে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান রায় ঘোষণা করেন।
সেদিন জনাকীর্ণ আদালতে ২০ আসামির সর্বোচ্চ সাজার রায় ঘোষণা করে বিচারক বলেন, ‘মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাদের গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ প্রদান করা হল।’ মৃত্যুদণ্ড ২০ আসামিই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
বাকি পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারিক আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে, সে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। এ জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুসারে বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলার যাবতীয় নথি হাইকোর্টে পাঠাতে হয়; যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত।
২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি আবরার হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। অন্যদিকে আসামিরাও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ১০ ফেব্রুয়ারি ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে নতুন করে শুনানি শুরু হয়।