Status

হাসিনা পরিবারের অর্থপাচার অনুসন্ধানে যৌথদল

রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের রক্ত ও ঘামে ভেজানো টাকায় অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার সহ এমন কোন অপকর্ম নেই যা করেনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার।

পাহাড় সমান দুর্নীতির অনুসন্ধানে একযোগে কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিশেষায়িত দুটি ইউনিট ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট ইউনিট ও কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এতথ্য জানা গেছে। দুদকের উপপরিচালক মো. মনিরুল ইসলামকে দলনেতা করে মোট আট সদস্যের যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল পুনর্গঠন করা হয়েছে। দুদকের চারজন, সিআইডি ও এনবিআরের দুইজন কর্মকর্তাকে এই অনুসন্ধান দলে রাখা হয়েছে। দুদকের বাকি তিনজন সদস্যরা হলেন-সহাকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া, এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর ও এম এম রাশেদুল হাসান। সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ও উপ-পুলিশ পরিদর্শক মো. ইকবাল হোসেন। এছাড়া এনবিআরের ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্টের কর পরিদর্শক সাইয়েদ মোহাম্মদ শোআইব ও কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের রাজস্ব কর্মকর্তা মোছা. ইশরাত জাহান।

শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা এবং তার ছেলে-মেয়ে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক, টিউলিপ সিদ্দিকসহ এই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে অর্থপাচার, রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাজউকের প্লট বরাদ্দ নেওয়ার পাশপাশি আশ্রয়ণ, বেজা ও বেপজার আটটি প্রকল্পে ২১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্র প্রকল্পে ৫৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি সহ হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ আছে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে অফশোর ব্যাংকিং হিসাব ও পরিচয়পত্র সংক্রান্ত নথি সংগ্রহের জন্য একাধিক দপ্তরে চিঠি পাঠানো, কর নথি পর্যালোচনা, জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পত্তি অর্জন; ঘুষ, অব্যবস্থাপনা, অর্থপাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ অনুসন্ধানে কাজ করবে এই দল।

আইন ও বিধি অনুযায়ী অভিযোগের অনুসন্ধান কাজু শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে এই দলকে। সেই সঙ্গে অনুসন্ধানের সময়ে কোন ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধকরণ বা কোন সম্পদ ক্রোক করা হলে এই দলকে অবহিত করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপরই পতিত সরকারের দুর্নীতির নানা দিক বের হতে থাকে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, দলটি ক্ষমতায় থাকাকালে প্রায় ১৬ বছরে অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে শেখ রেহানা ও পুরো শেখ পরিবারের সদস্যরাও বেপরোয়া ছিলেন।

তাদের আত্মীয়-স্বজনের নাম ভাঙিয়েও অনেকে অনিয়ম-দুর্নীতি করে টাকা কামিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর ওই সব টাকা বিদেশে পাচার করেছে। খোদ শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেন একবার পাচারের টাকাসহ দুবাইয়ে আটক হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ রকমভাবে অনেক দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর আমলা, রাজনীতিবিদ, এমপি, মন্ত্রীও ওই সময় দুর্নীতির টাকা তাদের প্রশ্রয়ে পাচার করেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে।

যারা বিদেশে আজকে শীর্ষ ধনী হয়েছেন, আলাদা সাম্রাজ্য গড়েছেন, তারা সরাসরি শেখ পরিবারের প্রশ্রয় পেয়েছিলেন বলে প্রচার রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় যত তদন্ত, অনুসন্ধান হচ্ছে-এ বিষয়গুলো নজরে আনছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ থেকে কি পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই দেশের কোন সংস্থার কাছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ট্রেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, হাসিনার শাসনামলে দেশ থেকে অন্তত ১৪ হাজার ৯২০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।

বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হলেও এখন পর্যন্ত পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার দৃষ্টান্ত মাত্র একটি। সিঙ্গাপুরের আদালতের নির্দেশে ২০১২ ও ২০১৩ সালে ফেয়ারহিল নামের একটি পরামর্শক সংস্থার নামে ব্যাংকে গচ্ছিত থাকা প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার দেশে ফেরত পাঠানো হয়ের্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের আদালতের নির্দেশনার পরও মামলাটি নিষ্পত্তি হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩ বছর।

বিশ্বের যেকোন দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার প্রক্রিয়া খুবই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অর্থ পাচরের নথিপত্র সংগ্রহ, পাচারের গতিপথ নির্ধারণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও পাচার হওয়া দেশের আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হতে সর্বনিু সময় লাগবে পাঁচ বছর। বেশি জটিল হলে এক্ষেত্রে ১৫-২০ বছরও লাগতে পারে।

তবে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী হলেও অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন না প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়া শেষ করে টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া কেমন হবে; তা অনেকাংশেই সরকারের মনোভাবের উপর নির্ভরশীল। বর্তমান সরকারের কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা না থাকায় তাদের জন্য স্বজনপ্রীতি দেখিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়ার চাপ কাজ করবে না। এছাড়া বর্তমান সরকার প্রধানের সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে। টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করবে।’

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতণের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার এই পাচার হওয়া টাকা উদ্ধারে তৎপর। এজন্য প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা ছাড়াও দেশে থাকা সম্পদ রাষ্ট্রের অনূকূলে বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রি করে টাকা আদায়ের দিকে হাঁটছে সরকার।

Source link

Leave a Reply

Back to top button